গণতন্ত্রের ঘোড়া

ভোটযুদ্ধে যত মিম, ছড়া আর ব্যঙ্গকৌতুক দেখেছি সোশাল মিডিয়া জুড়ে, সেসব একসাথে জড়ো করার ব্যবস্থা করলে গোটা চারেক প্রমাণ মাপের অমনিবাস নেমে যাবে। এমনিই আজকাল বাড়ীর দেওয়াল ছেড়ে ফেসবুক দেওয়ালে নোংরা প্রবণতা বেশি, অন্তত এদিক থেকে মানুষ কিছুটা উন্নত হয়েছে বলা যায়। রাজনৈতিক ছড়া থেকে ব্যক্তিগত সামগান – সবকিছুই দেওয়ালে টাঙিয়ে দিচ্ছে সবাই। ভোট আসার ফলে তার পরিমাণ কথঞ্চিত বৃদ্ধি পেয়েছে।

ধরা যাক বিদ্যাসাগর মশাই। বেঁচে থাকলে তিনি অশ্রুমোচন সংবরণ করতে পারতেন না। যে জাতিকে তিনি সারাজীবন একাত্ম হতে বলেছেন ক্ষুদ্র স্বার্থ, তুচ্ছ আচারের শৃঙ্খলা ভেঙে, তারা সত্যিই একাত্ম হয়েছে। নাহলে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার পরে এই একতা বাঙালি দেখাল কি করে যে, প্রতি চারটি ফেসবুক প্রোফাইলের মধ্যে একটিতে বিদ্যাসাগর স্বয়ং উপস্থিত হলেন। পোস্ট করেছিলাম সন্ধেবেলা কেউ চায়নাটাউন যাবে কিনা। তিনজন বিদ্যাসাগর তাতে সম্মতি দিলেন! ভয় পেয়ে আর কোথাও গেলামই না। ওই একই ঘটনায় জানতে পারলাম যে বাঙলার বিভিন্ন প্রান্তে কত মানুষ রয়েছেন, বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন পেশার, যাঁরা বিদ্যাসাগর কলেজে পড়েন, কলেজের খুব কাছে থাকেন, খুব কাছ থেকে ঘটনাটা দেখেছেন, তাঁরা লজ্জিত। এমনকি তাঁরা একই বানান ভুল করেন, একই জায়গায় দাঁড়ি, কমা দেন আর একই ভাষায় ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট করেন।

অবশ্য চৌকিদারেরা আজকাল তাই চান। এক দেশ, এক জাতি, এক ভাষা। তবেই দেশপ্রেম বাড়বে,ভক্তি চুঁইয়ে পড়বে। কেউ অন্যকথা বললে তা তাঁদের হজম হয়না। দেশপ্রেমের ট্যাবলেট গেলাতে হয়। খাবার চাইলে ভক্তের দল তেড়ে আসেন “সিয়াচেনে সেনা দাঁড়িয়ে আছে, আর তুমি খাবার চাইছো? লজ্জা করেনা?” লজ্জায় অধোবদন হয়ে থাকা ছাড়া জনতার খুব বেশি কাজ নেই। বড় আশা নিয়ে ভেবেছিলাম পনেরো লাখের কিছুটা দিয়ে বাড়িটা সারাবো আর বাকিটা ব্যাঙ্কে ফিক্সড করে ডাল্ভাত খেয়ে কাটিয়ে দেব। কোথায় কি? নীরবে দেখে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

ভোটের বাজার সরগরম। বুথফেরত সমীক্ষায় দেশ ফুটছে। এই প্রসঙ্গে ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল। প্রতিটি নির্বাচনের সন্ধ্যায় অনিল বিশ্বাস তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গীমায় প্রেস মিটিং এ বলতেন নির্বাচন অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ হয়েছে, কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনায় বিরোধীদলের দুস্কৃতিদের হামলায় শাসকদলের শান্ত কমরেডরা আহত হয়েছেন।

কলেজে আমরা যেখানে আড্ডা দিতাম, ক্যান্টিনের সেই দিকে ব্রজদা চপ ভেজে রাখতো। ব্রজদা বলতো আলুর চপ। আমরা বলতাম ভোটের চপ। আলুর প্রতিশ্রুতি আছে কিন্তু আলু নেই।

ভোট নিয়ে রঙ্গ রসিকতা আমাদের মজ্জায়। বৃহত্তম গণতন্ত্র উদযাপন বলে কথা। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, প্রয়াত জ্যোতি বসুকে নিয়ে প্রচুর রসিকতা চালু ছিল একসময়। প্রয়াত সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তের কমিউনিস্ট বিরোধিতা এখন কিংবদন্তীর পর্যায় চলে গেছে এখন। তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক বর্তমান পত্রিকায় প্রায় দুবছর ধরে সারাবিশ্বের কমিউনিস্টদের নিয়ে ছোট ছোট চুটকি প্রকাশিত হত। প্রতি সপ্তাহে। কমিউনিজম সফল হোক বা ব্যর্থ, মানুষকে নির্মল আনন্দ দিয়েছে। ভুলে ভরা পৃথিবীতে এই বা কম কি।

যদিও বর্তমান সময়ে, অন্তত আমাদের রাজ্যে শাসকের সাথে রসিকতা করা বড় বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তবু কবিতার বই আলাদা উল্লেখের দাবী রাখে। তার মধ্যে দু একটি সাগরছেঁচা মাণিক্য বর্তমানে স্কুলপাঠ্যও বটে। এই যে সবাই বলে যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা অনেক বেশী এগিয়ে, তা ওয়ি সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা কবিতা পড়লে যে কেউই কয়েকধাপ এগিয়ে যবে। সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার হল বলে। ছাত্রছাত্রীদের এই অগ্রগতির জন্যই সিলেবাস শেষ হয়ে যায়, শিক্ষক-শিক্ষিকারা টিচার্স রুমে বসে লুডো খেলেন। বাধ্য হয়েই গরমের ছুটি বাড়িয়ে এখন দুমাস ।

এ প্রসঙ্গে বাংলা রম্যরচনায় যাঁকে আমি গুরু মানি, সেই সৈয়দ মুজতবা আলি সাহেবের একটা কথা মনে পড়তে বাধ্য। স্বপ্নের পোলাওতে ঘি ঢালতে কিপ্টেমি করা উচিত নয়। আমরাও স্বপ্ন দেখছি, এরপরে সরকারী দপ্তরেও গরমের ছুটি পড়ল বলে। অনুপ্রেরণা মানুষকে অনেকদূর নিয়ে যায়।

একটু অন্যরকম ভোটের গল্প বলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ পরিচ্ছদে। অক্ষশক্তির পতন ঘটেছে, জাপান বাদে। জার্মানির পটসড্যাম। এক দশক আগেও সে শহরে দুনিয়াদারী করেছেন মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভা, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। এ তাঁর জন্মভূমি। সসাগরা পৃথিবীর তিন মালিক – জোসেফ স্ট্যালিন, হ্যারি ট্রুম্যান আর উইনস্টন চার্চিল হাজির হলেন সেখানে। নিয়ন্ত্রিত হল পৃথিবীর ভবিষ্যত। তার আগেই গ্রেট ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চার্চিল, বাকি দুই রাষ্ট্রনেতার সাথে আলোচনা করে এলেন জাপানের ভবিষ্যত নিয়েও। প্রধানত হ্যারী ট্রুম্যানের সাথে। আজ্ঞে না, এনোলা গে তখনও জাপানের উপর উড়ে যায়নি। হিরোশিমা তখনও আছে। সেদিনই রাতে নির্বাচনের ফলঘোষণা হল। চার্চিল, হেরে গেলেন। হ্যাঁ, বিশ্বযুদ্ধ জিতলেও, দেশের মানুষ চার্চিলকে নির্বাচনে জেতাননি। চার্চিল সখেদে বলেছিলেন – “দেশের মানুষ আমাকে যুদ্ধটা শেষ করতে দিলনা”।

অবিশ্বাস্য? হয়তো। আসলে নির্বাচন, রাজনৈতিক নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তর নয়। যুগসন্ধি। জীবনের মতই অনিশ্চিত। তাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ পাহারাদারকেও নামতে হয় মাঠে।, অপ্রত্যাশিত তরুণ পিছনে ফেলে দেন অভিজ্ঞ সাংসদকে, বছরের পর বছর ক্ষমতার অলিন্দের অহঙ্কার যখন চেপে বসে শাসকের মাথায়, জনতাই তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

নির্বাচন ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যেও বটে। দুনিয়াদারীর দু কুড়ি সাতের খেলাটা শেষ করার সময় যদি তারা প্রশ্ন করে কি করেছ আমার জন্য? তখন? বিষাক্ত বাতাস, খরা- ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়া গ্রহটার দিকে তাকিয়ে এটুকু বলতে পারবেন যে চেষ্টা করেছিলাম। ভোট মানে শুধু নির্বাচন নয়, নিজের অধিকার প্রয়োগের ওই চেষ্টাটুকুও বটে।

তবে ওই আর কি! আমাদের নেতারাও কেউ চার্চিল নন, আমরাও ব্রিটিশ নই। মানুষকে দেবতা বানানো আমাদের জাতীয় কর্তব্য, তার ভুল ধরালে গালি খাওয়া আমাদের ভবিতব্য। সুতরাং কা তব কান্তা কস্তে পুত্রা। গণতন্ত্রের ঘোড়া দুর্মরবেগে দৌড়বে, আমার আপনার সাধ্য কি তাকে লাগাম পরানোর।

চোপ। গণতন্ত্র চলছে।

লেখা – দীপব্রত

ছবি – গৌতম

Statutory warnning

The photographs and articles/scripts featured in this blog section are exclusive intellectual properties of Booze Production. Reproduction or copying of these content (photo or text) in any form – electronic or print in any medium and in any geographical location is strictly prohibited without the prior written consent of Booze Production and if such material is found copied or produced anywhere even if coincidental, Booze Production would have the rights to proceed on litigation for violation and infringement of copyright and intellectual property.