তুমি আমি আর ফেবু

তখন অন্য এক সময়। আইফোন সবে জন্মেছে, এইচএমটি ঘড়ি তখনও বাজারে চালু, শহরের এপ্রান্ত থকে ওপ্রান্তে পৌঁছতে সাবেক হলুদ ট্যাক্সিই তখনও ভরসা। তখনও হলুদ স্ট্রিটলাইটের আলো ঘিরে থাকতো কলকাতাকে, সদ্য পেরিয়ে আসা ইশকুলবেলার কোঁচড়ে আবেগের ওম তখনও বিরাজমান।

সেইসময়ই এক উৎসাহী বন্ধুর দৌলতে প্রথম চেনা অর্কুট। প্রথম আলাপ ভার্চুয়াল জগতের সাথে। প্রথম, অচেনা মানুষকে ছায়ামানুষ ভেবে কথা বলা।

কাট টু দুহাজার উনিশ। অ্যান্ড্রয়েড দখল নিয়েছে মার্কেটের। প্রতিদিন নতুন টেকনোলজি। এমনকি মানুষের গোপনতম মূহুর্তও উন্মোচিত হয়ে পড়ছে, চলে আসছে দুনিয়ার সামনে। সবাই সোশ্যাল মিডিয়ায় #happyme ইমেজ তৈরি করতে ব্যস্ত।

হঠাৎই খবর এল। পরপর, কয়েকটা আত্মহত্যার। একজন খুবই চেনা। আগেকার সময় হলে, বাড়ি যাওয়া বা আত্মীয় পরিজনের সাথে দেখা করা। এখন তো ফেসবুকেই শেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।

ছেলেটি ফোটোগ্রাফার। প্রোফাইল দেখে অবাক হওয়ার পালা। যে মানুষটা নিজের সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে এত গুছিয়ে রাখে সে আত্মহত্যা করতে যাবে কেন? আরো খুঁটিয়ে দেখি। মৃত্যুর আগেরদিন একটা মোটিভেশনাল ভিডিও শেয়ার করেছিল, একটা লাইটিং টেকনিক নিয়ে আর্টিকল, মেয়ের সাথে একটা ছবি। মৃত্যুর দিন সকালবেলা দেওয়ালে লিখে দিয়েছিল “হ্যাপি এন্ডিং। হ্যাপি মি।” বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করেছিল প্রোজেক্ট শেষ হল কিনা। তারপর দাবানলের মত খবর ছড়াল মৃত্যুর, সেই স্টেটাসেই বন্ধুরা এসে শোকপ্রকাশ করলো, বললো খুব খারাপ করলি এটা। এবং, আশ্চর্য ব্যাপার, দুএকজন মানুষ সেই স্টেটাসেই লঘু রসিকতাও করতে শুরু করলেন। লঘু এবং চটুল।

সোশাল মিডিয়া একটা অদ্ভুত জায়গা। সোশাল মিডিয়ার ব্যাপ্তি, তার ডায়নামিক্স, পুরো ব্যাপারটাই মানুষের তৈরী সমাজকে নাড়িয়ে চারিয়ে উঠে বসতে বাধ্য করেছে। বহুবছর আগে এরকম অনেক আর্টিকল বেরোত যে সোশাল মিডিয়া মানুষকে একা করে দিচ্ছে, মানুষকে লোভ দেখাচ্ছে, ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগাচ্ছে। প্রথমদিকে ঠিক মনে হোত। তারপর যখন সোশাল মিডিয়ার বন্ধুরা বাস্তবেও বন্ধু হয়ে গেল তারপরে মনে হতোনা কিন্তু।

আসলে ব্যাপারটা জটিল। ধরা যাক ফেসবুকে দশজন মানুষ আছে। তারমধ্যে একজন প্রবল জনপ্রিয়, সে বাকি নজনের ফ্রেন্ডলিস্টেই আছে। বাকি প্রত্যেকের ফ্রেন্ডলিস্টে বন্ধুর সংখ্যা দুই থেকে তিন। তারা দেখছে প্রতি দুই কি তিনজনে একজন জনপ্রিয়। প্রত্যেকেই চেষ্টা করছে জনপ্রিয় হওয়ার। কেউ হচ্ছে, বেশিরভাগই হচ্ছেনা। বাস্তবের ঘটনাটা দুজন তিনজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাজার দুহাজারজনের ফ্রেন্ডলিস্টে ছড়ানো।

সোশাল মিডিয়াতে আমরা যেভাবে নিজেদের জাহির করি, আমার ফ্যানফলোয়িং, আমার পোস্ট লাইক, শেয়ার, কমেন্ট, সেলফি, বাড়ি গাড়ি- প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

এবার এইখানেই উঠে আসে অন্য প্রশ্নটা। এই যে আমরা একজনের প্রবল জনপ্রিয়তা নিয়ে কথা বলছিলাম, আচ্ছা তার কেমন লাগে? এই প্রবল জনপ্রিয়তা, কিছু পোস্ট করলেই লোকজনের “অসাধারণ” বলে দেওয়া, রাস্তায় লোকজনের চিনে ফেলে যেচে এসে কথা বলে যাওয়া, কেমন লাগে ওর? মানুষটা কি সত্যিই ওইরকমই, যেমনটা আমি সোশাল মিডিয়ায় দেখি?

অনেকক্ষেত্রেই গল্পটা অন্যরকম। যে আত্মহত্যার ঘটনা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, এটা তার পরের ঘটনা। ছেলেটির ভালো এক বন্ধু, ঘটনাচক্রে সে আমারও বন্ধু, বললো “আমরা কত যত্ন নিয়ে মুখোশগুলো সাজাই না?” জানলাম ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত অসুখী ছেলেটি ফেসবুককেই বেছে নিয়েছিল নিজেকে সুখী রাখতে। এমনকি যেসব স্টেটাস দিত, ফাইভস্টারে খেতে যাচ্ছি, এখানে ঘুরতে যাচ্ছি, ওখানে আড্ডা মারছি, সেসবও বেশিরভাগই মিথ্যা। নিজের উপরে চাপ সৃষ্টি করতে করতে একসময় সেই বোঝার তলায় চাপাই পড়ে গেল।

তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া পুরোটাই খারাপ? না, তা কেন! এই যে এত এত মানুষ এত এত বন্ধুকে পাচ্ছে, এত যে সামাজিক সমস্যা উঠে আসছে, সেগুলো খারাপ হবে কেন? মিটু থেকে হোককলরব, সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলে হতই না। মানুষ নিজের ভালনারেবিলিটি শেয়ার করছে, ভয়ের কথা, অসহায়তার কথা আলোচনা করছেন।

ধরুন নাসের ইয়াসিনের কথা। ইজরায়েলের ছেলে, আমেরিকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইকনমিক্সের ছাত্র, পেপ্যালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কোডার। চাকরী ছেড়ে দিতে বেরিয়ে পড়লেন পৃথিবীভ্রমণে, ফেসবুক পেজে ঘোষণা করলেন আগামী হাজারদিনে হাজারাটি এক মিনিটের ভিডিও পোস্ট করবেন। শুরু করলেন কেনিয়া হয়ে। কথা রাখলেন। অ্যান্টার্ক্টিকা বাদে পৃথিবীর সবকটি মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দেশে গেছেন এবং তাদের বিচিত্র মানবিক গল্প তুলে ধরেছেন। সাহায্য পেয়েছেন। উদ্বুদ্ধ করেছেন। ওনার ফেসবুক পেজের নাম ন্যাস ডেইলি। ফেসবুকের জনপ্রিয়তম ভিডিও ব্লগার। তুলে ধরেছেন দেশহীন এক সিরিয়ান নাগরিকের কথা যিনি এয়ারপোর্টে জীবন কাটাচ্ছিলেন। ন্যাসের ভিডিও দেখে কানাডা তাকে আশ্রয় দেয়। পৃথিবীর যত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে আঞ্চলিক ছায়ায় ধরেছেন ন্যাস। পরিবেশ থেকে শুরু করে ধর্মের সন্ত্রাস, সব।

কিংবা ধরুন আরব বসন্তের সেই ঘটনা। মিশরের গণঅভ্যুত্থান। প্রতিবাদী এক মেয়েকে গুলি করে মারল স্বৈরাচারী শাসকের সৈন্য। সে ঘটনার ভিডিও মূহুর্তে ছড়িয়ে পড়ল সোশ্যাল মিডিয়ায়। উত্তাল হয়ে উঠল গোটা আরব দুনিয়া। পতন ঘটলো শাসকের।

বলতে গেলে আরও। কিভাবে হারিয়ে যাওয়া দুই বোনকে ছাব্বিশ বছর পর মিলিয়ে দিল ফেসবুক, আত্মহত্যা করতে যাওয়া কিশোরকে দুহাজার মাইল দূরে বসে থাকা বন্ধু আলো দেখায় ফিরে আসার। জীবনের সব হারিয়ে ফেলা মানুষগুলো কিভাবে লড়াই করে ফিরে এলো সবকিছু জিতে নেওয়ার লক্ষ্যে, সোশ্যাল মিডিয়া সেই গল্পগুলোও বলে।

আসলে দিনের শেষে আমরা প্রত্যেকে একেকটা ডেটা পয়েন্ট। যাকে ঘিরে সারাদিন অদৃশ্য একটা সার্ভার, অ্যানালিসিস করে চলেছে। কোথায় যাচ্ছে, কি খাচ্ছে, কি কি দেখছে, কি বলছে, কোথায় হোঁচট খাচ্ছে, কি কি প্রোডাক্ট একে বিক্রী করা যাবে।

সভ্যতার সবচেয়ে বড়ো মজা হলো সে মানুষকে বাইনোমিয়াল থিয়োরেমে অভ্যস্ত করে তোলে। ইলিশ না চিংড়ি? বাম না ডান? নাল এন্ড ভয়েডের চিওরকালীন দ্বন্দে পড়া মানুষ সোশ্যাল মিডিয়াতেও সেই বাইনোমিয়ালেই আটকে যায়। সাদা আমি না কালো আমি? তাজা আমি না ক্লান্ত আমি? অসম্ভব পন্ডিত মানুষের প্রোফাইলে দেখি সেলিব্রিটির সাথে হাসি হাসি মুখে ছবি, সঙ্গে ক্যাপশন, বেশ উল্লসিত। সব বিষয়েই বক্তব্য রাখতে গিয়ে নিজেকে ছোট করে ফেলেন যিনি, তিনিই আবার দুমাস আগে লিখেছিলেন “কি বলবোর চেয়েও বেশি জরুরী, কি বলবোনা, সেটা জানা”।

জীবন বৈপরীত্যময়। সারাজীবন মধ্যবিত্ত জীবন কাটানো মানুষ একদিন ফেসবুকে দেখেন একটা বাচ্চা ছেলের অপারেশনের জন্য কয়েক লক্ষ টাকা দরকার। সাত পাঁচ না ভেবেই সারাজীবনের সঞ্চয় উপুড় করে দিলেন। আবার সমাজকর্মী , জেন্ডার ইকুয়ালিটির সমর্থক তরুণী মুখ খোলেন নারী নির্যাতনের অভিযোগে বিদ্ধ তাঁর তরুণ অধ্যাপক বন্ধুর সমর্থনে, সব অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হওয়ার পরেও।

সময়ের সাথে চোখ পালটায়। পালটায় বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়তা। জীবন কাহিনী হয়ে ওঠে। অনেকগুলো কাহিনী জুড়ে জুড়ে তৈরী হয় সমাজ, মনস্তত্ত্ব। প্রাচীন মানবসভ্যতা এই আধুনিক যুগে এসে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্যের মত বেশকিছু প্রয়োজনীয়তাকে সমাজের জন্য আবশ্যিক করেছে, জাতি-ধর্ম-ভাষা নির্বিশেষে। তেমনই সমাজ তৈরীর অন্যতম চালিকাশক্তি – ধর্ম, নিজেই সৃষ্টি করেছে নিজের নেমেসিস – ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ। সোশ্যাল মিডিয়াকে মানুষ নিজের নেমেসিস বানাতে পারে সহজেই।

তবুও আমরা দৌড়চ্ছি। আশেপাশের ট্র্যাকে কারা আছে জানা নেই। শুধু দেখছি তাদের ক্রমশ আমার মতই দেখতে হয়ে যাচ্ছে। আর, আমার সামনের পথে একটা আয়না অপেক্ষা করছে। মুখ আর মুখোশের তফাত কমে আসছে। আর আমরা দৌড়ে যাচ্ছি। কিন্তু কোন লক্ষ্যে? বৃহত্তর সমাজ গড়তে? আধুনিকতর মনন গড়তে? নাকি নেমেসিস তৈরীতে?

হয়তো সময় উত্তর দেবে।

লেখা – দীপব্রত

ছবি – গৌতম

(আমার বন্ধু-দিদি, কবি রাকা দাশগুপ্ত-র একটি ফেবু পোস্ট এই লেখার উৎসমুখ। রাকাদির লেখার কিছু অংশ ব্যবহারও করেছি এই লেখায়।)

Statutory warnning

The photographs and articles/scripts featured in this blog section are exclusive intellectual properties of Booze Production. Reproduction or copying of these content (photo or text) in any form – electronic or print in any medium and in any geographical location is strictly prohibited without the prior written consent of Booze Production and if such material is found copied or produced anywhere even if coincidental, Booze Production would have the rights to proceed on litigation for violation and infringement of copyright and intellectual property.