পয়লা বৈশাখ

    আমরা তো সেইসব স্বপ্ন বুকে নিয়েই এগিয়ে যাই। হাজার প্রতিবন্ধকতা, প্রতিদিনের পাওয়া না পাওয়া ছেড়ে সেই আকাঙ্খিত আলোর জন্যেই তো আমাদের পথ চলা। এমন আলো যেখানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, আজকের ভালো থাকার পরেও আশা থাকে – আগামীকালও ভালো থাকবো।

    আগামীকালও ভালো থাকবো

    সময় তো কোনও জাদুকর নয় যে হিলিগিলি হোকাস ফোকাস বলবে আর অপছন্দের মূহুর্তগুলো উধাও হয়ে যাবে, যেভাবে আমাদের দেশ থেকে উবে যাচ্ছে ভালো থাকা। অথচ প্রতিবার নতুন বছর আসে, প্রতিশ্রুতি নিয়ে, আনন্দ নিয়ে, চাপা হতাশা নিয়ে। ছেলেবেলায় চৈত্র সেলের ভীড়ে মায়ের হাত ধরে যখন দেখেছি সস্তাদরে ভালো জিনিষ খোঁজার আকুতি, ভাবতেও পারিনি একদিন পরবর্তী জীবনের রঙীন সফেন সমুদ্র আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে মধ্যবিত্ত চৈত্র সেল থেকে বহুদূরে শুভ নববর্ষ বোনানজা আর পয়লা বৈশাখ বুফে লাঞ্চে। সেখানে গার্নিশ করা মাছের টুকরো উশখুশ করে, সোনালী বিয়ারের সাথে তার অনাস্বাদিত নিষিদ্ধ অভিসারের। টেলিফোন ক্রেডলের হাতলে রিসিভার নামিয়ে রাখার মতোই কবে জীবন থেকে নামিয়ে রেখেছি সারল্য, ঈপ্সা, নিজস্ব নির্জনতা। ছোট দুঃখ, ছোট সুখের বাগানে সাজানো থাকে স্টেট অফ দ্য আর্ট টেকনোলজি, মোবাইল গেমের কখনও না ফুরনো দৌড়।

    বাঙালীর জীবনে বসন্তকালও আর পাঁচটা ভালো জিনিষের মতই ক্ষণস্থায়ী। সেই ক্ষণজীবি বসন্তের পরেই আসে কালবৈশাখী। তারপরে বৈশাখী। জীবনের মতই। ভালো-খারাপ-ভালো। কালের চক্র, আবর্ত।

    একটা জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। অধিকারবোধে, মমত্বে, প্রেমে জন্ম দিয়েছে গোটা একটা দেশের। বারবার গর্জে উঠেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচার-স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে, দুর্নীতি আর সামরিক শক্তির অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে। ভাষা দেশ হয়ে উঠেছে বারবার। দেশ হয়ে গেছে ভাষা – প্রতিবাদের। পয়লা ্বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়েছে দেশের মঙ্গল কামনায়, অত্যাচারী, স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে। নতুন বছর সে দেশে এনেছে, ক্রুদ্ধ আবেগের ঝংকার, বারবার ফেটে পড়েছে, আছড়ে পড়েছে, ঢেউ এর মত ব্যর্থ আকাঙ্খায় ফিরে গেছে, আবার এসেছে, আঘাত করেছে।

    “যদি আমি দেশ হয়ে শুয়ে থাকি আর এই বুকের উপরে যদি চলে যায়

    হাজার হাজার পা-র চলাচল” (শঙ্খ ঘোষ)

    অথচ দেশ বলতে এখনও আমরা সীমান্ত বুঝছি। কাঁটাতার বুঝছি। দেশপ্রেম বলতে আনুগত্য বুঝছি। বুঝছিনা, মানুষই দেশ। যে লোকটা উলটানো মুখোশ পরে সুন্দরবনে বাঘের জঙ্গলে মধু আনতে যায়, সে-ই তো দেশ। যে মানুষটা নিজের সব স্বপ্নকে কেরানীর চাকরীর কলম্পেষার ওপারে রেখে এসেছেন, তিনি দেশ। যে মেয়েটার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে দিয়েছে ওর প্রাক্তন বন্ধু, সে দেশ। আমরা দেশ।

    আমাদের একথা বুঝতে দেওয়া হচ্ছেনা। বলা হচ্ছেনা মানুষের কথা, জীবনের কথা, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের কথা।

    শোনা যায় রাজা শশাঙ্কের আমলে প্রথম এই বঙ্গদেশের ধারণার প্রচলন হয়। পরে হুসেন শাহ এবং মুঘল সম্রাট আকবর হিজরি সনের বদলে বাংলা তারিখ গণনা অনুযায়ী কর নেওয়ার প্রথা চালু করেন। সারা আর্যাবর্তব্যাপী উৎসব হয় এইসময়, যার নাম “বৈশাখী”। এই সময়েই, পয়লা বৈশাখের ঠিক আগের দিন, চৈত্র-সংক্রান্তির চড়ক ছিল বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসব। কালের পলি পড়ে সে এখন আড়ম্বরহীন, ফিকে।বেশী নয়, পৌনে দুশো বছর আগেও দুর্গাপুজোর চেয়ে জৌলুস বেশি ছিল চড়কের মেলার। কলকাতার বাবুদের পৃষ্ঠপোষকতায় চড়ক ছিল সেরা উৎসব। দুর্গাপুজোর জমকে তা চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু অনস্বীকার্য একটা ব্যাপার। বাঙালীর সবচেয়ে বড় ধর্মবিহীন উৎসব কিন্তু পয়লা বৈশাখ।

    নিঃসঙ্গ জীবন

    নতুন বছর মানে তো শুধুই শুভেচ্ছা নয়। ভাগ করে নেওয়া। সামনের দিকে তাকানো। শিলনোড়া, পঞ্জিকা, কয়লার উনুনের সাথে বাংলা ক্যালেন্ডারও এখন বিদায় নিয়েছে ঘর থেকে, পুজো আর আচার-অনুষ্ঠান ছাড়া তারও খুব একটা কাজ নেই। নিঃসঙ্গ জীবন। পড়ে থাকা, ধুলোমাখা।

    হয়তো কেউই কখনও আর দেখবনা বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতা। মোবাইলেই দেখে নেব। হয়তো বদলে যাবে সমাজ, মূল্যবোধ – যাচ্ছেও তো, ধীরে ধীরে। পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রুবক, কে অস্বীকার করতে পারে। তবুও পয়লা বৈশাখ থেকে যায়। উৎসব, ছুটির দিন, মাংস-ভাত হয়েই থেকে যায়। ধুঁকতে থাকা বইপাড়ায় থেকে যায়। হালখাতার প্রার্থনায় থেকে যায়। গ্রামীণ গাজনের মেলায় থেকে যায়। ময়দানের বারপুজোয়, প্রকাশকদের ঘরের মিষ্টি আর ঠান্ডা পানীয়তে থেকে যায়। ছেলেবেলায় থেকে যায়। চেনা দোকানে পাওয়া অচেনা মিষ্টির বাক্সে থেকে যায়।

    পয়লা বৈশাখ অনেকটা সেই হেমন্তের দুপুরের রোদের মত। শরতের সে তেজ নেই, কিন্তু কনে দেখা আলো আছে, আসন্ন শৈত্যের আভাস আছে, ভালোলাগার ওম আছে, বৃদ্ধ বয়সের স্নেহ আছে। যৌথপরিবারের সেই বড়ঠাম্মার মত, যিনি বয়সের ভারে অশক্ত, কিন্তু বাড়ির ছোটদের জন্য ঠিক নিজের ভাঁড়ার থেকে নাড়ুটা, আমসত্ত্বটা বার করে দেন।

    নাহয় ভালোবেসেই মনে রাখলাম। কটা জিনিষই বা আর ভালোবাসার জন্য রয়ে গেছে।

    শুভ নববর্ষ। জীবনের জলছবি রঙীন হোক।

    লেখা – দীপব্রত

    ছবি – গৌতম, দীপব্রত

    These photos and the article are intellectual properties of Booze Production. Do not use any of these in any format without prior written permission.

    8 thoughts on “পয়লা বৈশাখ”

      1. ধন্যবাদ সৌরভ। চেষ্টা করেছিলাম মনের কোণে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিকে তুলে ধরতে। ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগছে আমাদের।

    1. ভালো লাগল পড়ে। আপনাদের অনুরোধ করছি কলকাতা আর তার আশপাশের ছোট বড় মন্দির মসজিদ গির্জা আর অন্যান্য ধর্মস্থানগুলি যে সর্বধর্ম সমন্বয়ের সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে তাই নিয়ে লিখুন।

      1. খুবই মূল্যবান এবং জরুরী একটি বিষয়কে তুলে আনলেন আপনি। অবশ্যই চেষ্টা করব আগামীদিনে এমন কিছু লিখতে। ভালো থাকবেন।

    2. Apurba. deep you are a 3D talent.beautiful pics and beautiful script. I am alone but not lonely.NIRJANATAR PRASANGe BoLLAM

      1. Thank you very much Anik. This is the real opium what we are thriving for….. We feel very humble. Please keep on eye on this blog. Every week we are coming up with new write up/script/story along with handful of photographs.
        And please…..please…..share this blog amongst your friends and acquaintances.

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *